Symphony Z30: বাজার কাঁপাতে পারবে সিম্ফনির আইকন ফোন?

নোকিয়া যেভাবে আমাদের মুঠোফোনের সাথে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, তেমনই, স্মার্টফোনের জগতে আমাদের অনেকেরই প্রথম পরিচিতি সিম্ফনি দিয়েই। তাই আস্থা ও ভালোবাসার জায়গায় সিম্ফনির অবস্থানটা সবসময়ই একটু স্পেশাল। সময়ের সাথে নিজেদের আপগ্রেড করতে না পারায় আস্থার জায়গা থেকে সিম্ফনি হয়ত অনেকটাই সরে যাচ্ছে, তবে, প্রথম স্মার্টফোনের ভালোবাসা হয়ত খুব দ্রুতই মিলিয়ে যাবে না…

২০২০ সালে নিজেদের চতুর্থ স্মার্টফোন নিয়ে এসেছে সিম্ফনি। মডেল Symphony Z30, দাম ধরা হয়েছে ৯৭৯০ টাকা, অর্থাৎ, প্রায় দশ হাজার টাকা। রিলিজের আগেই কিছু রিউমার থেকে ফোনটি বেশ হাইপ তৈরি করেছিলো। শোনা যাচ্ছিলো, এখানে থাকবে গ্লাস ব্যাক, 5000 mAh ব্যাটারি, ৪ জিবি র‍্যাম, ৬৪ জিবি ইনবিল্ট স্টোরেজ, আর সবচেয়ে আকর্ষণীয়, SD665 চিপসেট।

তবে তার কয়েকটি সত্য প্রতীয়মান হলেও সবগুলো হয়নি। আর এখানে SD665-ও থাকছে না। আশায় গুড়ে ইট বালি সিমেন্ট সব ঢেলে এখানে দেওয়া হয়েছে Helio A25, এইটা কোন কথা? যাক, আসল কথাটা হচ্ছে কথা তা নয়, মানে কথাটা হচ্ছে, সে কথায় পড়ে আসছি।

সবসময়ের মত ডিজাইন ও বিল্ড থেকেই শুরু করি। আমার কাছে Symphony Z30 ফোনটি দেখতে খুবই সুন্দর মনে হয়েছে। Symphony Z50 দেখতে দাম অনুযায়ী বেশ চিপ মনে হয়েছিলো। তবে Z30 এর ক্ষেত্রে এমনটি একদমই নয়। তাছাড়া এখানে গ্লাস ব্যাক ব্যাবহার করা হয়েছে। একারণে কারণে এর সৌন্দর্য্যে অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে।

দশ হাজার টাকার নিচে গ্লাস বিল্ড ফোন খুব একটা দেখা যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি স্মার্টফোন ডেভেলোপাররা মেটাল কিংবা গ্লাস বডির পরিবর্তে প্লাস্টিকের দিকেই ঝুঁকছে। বিশেষ করে মেটাল ফোন তো যেকোন দামে একদমই দুর্লভ। কিছুটা দামী ফোনেও সবকিছু ভালো দিয়ে তার সাথে আমরা প্লাস্টিক বডি ধরিয়ে দিতে দেখছি।

সম্ভবত, বর্তমান ক্রেতারা ভালো সিপিইউ ও ক্যামেরার জন্য বেশি আগ্রহী বলে বিল্ড কোয়ালিটিতে কম্প্রোমাইজ করা হয়।  অবশ্য এখন প্লাস্টিক বিল্ড ফোনগুলোরও উন্নতি হয়েছে। দেখতে তত চিপ লাগে না। প্রায়ই সেটাকে প্লাস্টিক না বলে আদর করে পলি কার্বনেট বলা হয়। কিন্তু যাই হোক, প্লাস্টিক তো দিনশেষে প্লাস্টিকই। একটা গ্লাস বডির ফোন যতটা প্রিমিয়াম ফিল দেয়, প্লাস্টিক কিন্তু কখনোই তা দেয় না। গ্লাস বিল্ড সবসময়ই একটি আকর্ষণীয় ফিচার।

তিনটি ক্যামেরা থাকছে ভার্টিকালি। সাধারণত মিডল অ্যালাইনমেন্টেই মডেল ও সিম্ফনি ব্র্যান্ডিং আমরা আগের সিম্ফনি ফোনগুলোতে দেখেছি। তবে এবার থাকছে ক্যামেরা বরাবর ভার্টিকালি। আমার পার্সোনালি এটা ভালো লেগেছে। ফোনটির দুটি কালার ভ্যারায়েন্ট থাকছে। Indigo Blue ও Amazon Green। আমার কাছে দুটি কালারই অসাধারণ লেগেছে। আলোর সাথে একরকম রঙের খেলা চলে ব্যাকপার্টে।

এরপর আসে ডিসপ্লে। 6.52″ এর V-নচ ডিসপ্লে। ডিসপ্লে টাইপ IPS In-cell। ডিসপ্লে রেজ্যুলেশন 720*1600 (HD+) এবং পিক্সেল ডেনসিটি 269 ppiG বড় ডিসপ্লেতে HD+ রেজ্যুলেশন হওয়ায় অবশ্যই ভালোভাবে খেয়াল করলে কিছুটা শার্পনেসের ঘাটতি চোখে পড়তে পারে, তবে ১৭০০০ টাকায়ও যখন HD+ দেওয়া হয়, তখন এটা নিয়ে অভিযোগ করার কোন সুযোগ নেই। তবে, চিন এরিয়া বেশ বড়, যেটা ভালো লাগেনি।

সামনে নচে দেওয়া হয়েছে 8MP এর একটি ক্যামেরা। আর পেছনে তিনটি ক্যামেরার মধ্যে মেইন ক্যামেরা হলো 13MP, তার সাথে 5MP Super Wide ক্যামেরা আর 2MP ডেপথ সেন্সর। বর্তমানে কোম্পানিগুলো উঠে পড়ে লেগেছে ক্যামেরার সংখ্যা বাড়াতে। তিন-চারটি ক্যামেরা না থাকলে জাতি আবার মেনে নয় কিনা… এজন্য দেখা যায় একটা 12MP বা 13MP, তার সাথে টেলিফটো, ডেপথ, নাইটভিশন, এআই প্রভৃতি নামে এমন কিছু ক্যামেরা দেওয়া হচ্ছে, যার ফাংশন অদৌ আছে কিনা সেটা বোঝাও দায়।

Symphony Z50 তে-ও আমরা 2MP করে টেলিফটো ও ডেপথ পেয়েছিলাম। এবার 5MP ওয়াইড অ্যাঙ্গেল দেওয়াটা তার তুলনায় প্রশংসনীয়। আসলে, A25 চিপসেট 13MP+5MP এর বেশি সমর্থনও করে না, তৃতীয়টি ডেপথ সেন্সর, সেটির কথা আলাদা। যাই হোক, আমরা জানি, ক্যামেরা মেগাপিক্সেল সবকিছু নয়। চিপসেট, সফটওয়্যার, ক্যামেরা সেন্সর সহ অনেক কিছু এখানে ভূমিকা রাখে। আমার যেহেতু নিজস্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাই ক্যামেরা নিয়ে আর মন্তব্য করছি না।

এবার আসছি বরাবরের মতই সিম্ফনি স্মার্টফোনের অন্যতম সমালোচিত অংশ চিপসেট নিয়ে। আগে যেমনটা বলেছি, এখানে থাকছে MediaTek Helio A25। এখানে আমি অবশ্য শতভাগ নিশ্চিত নই, সামাজিক মাধ্যমে এটার কথা-ই দেখলাম আর ক্লকস্পিড, বেঞ্চমার্ক স্কোর দেখে এটাই মনে হচ্ছে।

এর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি “Ultra-efficient octa-core with advanced connectivity and location services for ‘everybody’ 4G smartphones।” না, এটা আমার কথা নয়, মিডিয়াটেকের কথা। Z50-তে সিম্ফনি ব্যবহার করেছিলো Helio P25, যা ছিলো ৩-৪ বছরের পুরনো, সেখানে A25 একদমই নতুন চিপ, এবছরই শুরুর দিকে এসেছে আর অল্প কিছু ডিভাইসেই ব্যবহার হয়েছে এখন পর্যন্ত।

তবে খুশি হওয়ার কিছু নেই। আদতে এটি একদমই এন্ট্রি লেভেল একটি চিপসেট আর মোটেও তেমন ভালো কিছু আশা করতে পারছি না। খুবই খারাপ এমন নয়, কিন্তু ভালো বলারও কোন সুযোগ দেখছি না। আমার যেটা মনে হলো, এটিকে Helio P22 এর আন্ডারক্লক ভার্সন বলা চলে। একই আর্কিটেকচার, একই জিপিইউ, একই সিপিইউ কোর। P22 থেকে সিপিইউ ও জিপিইউ এর ক্লকস্পিড কিছুটা কম, তাছাড়া র‍্যাম ও ক্যামেরা একটু সমর্থনে একটু পিছিয়ে।

A25 12nm আর্কিটেকচারে বিল্ড করা একটি অক্টাকোর চিপসেট, যার কোরগুলো চারটি করে দুটি ক্লাস্টারে বিভক্ত, যাদের ক্লকস্পিড 1.8 GHz ও 1.5 GHz। সবগুলো কোর Arm Cortex-A53। এর সাথে জিপিইউ রয়েছে IMG PowerVR GE8320, যার ক্লকস্পিড 600MHz।

আমরা যারা গেম উল্লেখযোগ্য খেলি না; ফেসবুক, ইউটিউব, ব্রাউজিং, আর্টিকেল বা ব্লগ লেখা, পড়াশোনা সংশ্লিষ্ট কাজ এরকম টাস্কে ফোন ব্যবহার করে থাকি, তাদের জন্য আসলে খুব বেশি পাওয়ারফুল চিপসেট প্রয়োজন নেই এবং আমার ধারণা এই চিপসেট সেক্ষেত্রে যথেষ্ট। তবু, তারা যদি অন্তত P22 ব্যবহার করত, সেটি সম্ভবত ভালো হত।

ফোনটিতে র‌্যাম থাকছে ৩জিবি LPDDR4 ও রম থাকছে ৩২ জিবি। এই দামে ঠিক যেমনটা আশা করা যায়। স্টোরেজ ১২৮ জিবি পর্যন্ত এক্সপেন্ড করার সুযোগ রয়েছে।

ভালো বিষয়, এখানে Android 10 ব্যবহার করা হয়েছে। যখন Android 11 প্রায় চলে এসেছে, তখন সিম্ফনি প্রথম Android 10 সহ কোন ফোন বাজারে আনলো। এছাড়া এন্ট্রি লেভেলে আইটেল, ওয়ালটনসহ অনেক ব্র্যান্ডই এখনো তাদের লেটেস্ট ফোনগুলো Android 9.0 নিয়ে আনছে। আমার কাছে বিষয়টি বোধগম্য নয়, কেন এত সময় লাগছে এন্ট্রি লেভেলে Android 10 যুক্ত ডিভাইস আসতে। কারো জানা থাকলে কমেন্টে জানানোর অনুরোধ রইলো।

সিক্যুরিটি সেকশনে থাকছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর ও ফেস আনলক। ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর রেয়ার মাউন্টেড, আর ফেস আনলক ক্যামেরা বেজড। সেন্সরের তালিকা দেখলে প্রক্সিমিটি, লাইট ও গ্রাভিটি সেন্সর থাকছে। থাকছে না জাইরো ও কম্পাস। ফোনটির অন্যতম আকর্ষণ 5000 mAh এর হিউজ ব্যাটারী। তবে, টাইপ সি থাকছে না এখানে, মাইক্রো ইউএসবি টাইপ বি। কত ওয়াট চার্জিং সমর্থন করে তা আমার জানা নেই।

ফোনটির একটি সুন্দর ব্যাপার হলো, এখানে নোটিফিকেশন লাইট থাকছে। আরো থাকছে একটি গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বাটন। ভালো লেগেছে এ দিকগুলো।

এবার আমার মতামত দিই, সত্যি বলতে, আমি হতাশ হইনি। ডিজাইন, বিল্ড, ব্যাটারী, ডিসপ্লে, Android 10 সহ ভালো লাগার অনেক দিকই আছে। এর সাথে আরেকটু ভালো চিপসেট, জাইরো সেন্সর, সেলফি ফ্ল্যাশ যুক্ত থাকলে বেশ হত। কিন্তু যাইহোক, পার্সোনালি আমার ফোনটা ভালো লেগেছে। আর এটা আমি অস্বীকার করি না, সিম্ফনির প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে।

যাহোক, সিম্ফনির মানুষের চাওয়া বোঝা উচিৎ। সিম্ফনি বিষয়ে সবচেয়ে বড় দুটো অভিযোগ হলো, ভালো চিপসেট না থাকা ও সফটওয়্যার আপডেট না আসা। এছাড়া বেশ কিছু মডেলে ক্যামেরা নিয়ে আমরা অভিযোগ দেখেছি, যার কিছু আপডেটে সলভ করা হয়েছে, কিছু হয়নি। যদি রেগুলার আপডেট তারা না-ও দেয়, অন্তত এরকম ফিক্সগুলো দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়া অবশ্যই কাম্য।

ছবি ও তথ্য: অফিসিয়াল ওয়েবপেজ

কীওয়ার্ড: সিম্ফনি জেড৩০

0 0 vote
Article Rating
Default image
তাহমিদ হাসান
এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Shomon
Shomon
9 days ago

Bro type c port ki nei atate

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x