সময় ভ্রমণ (৪র্থ পর্ব): শূন্যস্থানে আলোর বেগ ধ্রুব, কিন্তু কীভাবে? (সহজ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা)

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আগের পর্বে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। আমরা জেনেছি, এই তত্ত্বের দ্বিতীয় মৌলিক স্বীকার্য অনুযায়ী, শূন্যস্থানে আলোর বেগ ধ্রুব। প্রসঙ্গ কাঠামো স্থির থাকুক কিংবা যেকোন গতিতে চলমান, এর সাপেক্ষে শূন্যস্থানে আলোর বেগ অবশ্যই ধ্রুব হবে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? চলুন, এই চমৎকার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা যাক।

একটু অতীত থেকে শুরু করি। আমরা এখন জানি, আলোর বেগ 3*108 m/s, আরো সূক্ষ্মভাবে বললে 299,792,458 m/s। কিন্তু, একসময় এটা মানুষ জানতো না, এমনকি এটাও জানতো না যে, আলোর বেগ বলে কিছু একটা আছে। মনে করা হত, আলো প্রজ্জ্বলিত হওয়ার সাথে সাথেই যেকোন দূরত্ব থেকে দেখা যাবে।

কিন্তু এই ধারণাটাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে দিয়ে, আলোর বেগ আছে কিনা, এটা নিয়ে প্রথম পরীক্ষা করেন ডাচ বিজ্ঞানী আইজ্যাক ব্যাকমেন। ক্যালেন্ডারে তখন ১৬২৯ সাল চলছে। তিনি দেখতে চাইলেন, বিভিন্ন দূরত্বে আলোর দৃশ্যমানের সময়ের কোন পার্থক্য পাওয়া যায় কিনা। এজন্য এক সারি আয়না সাজিয়ে গানপাউডারে বিস্ফোরন পর্যবেক্ষণ করলেন। তবে, দুঃখজনকভাবে, এই পরীক্ষাতে এর উত্তর সঠিকভাবে পাওয়া গেলো না।

এরপর ১৬৭৬ সালে আরেক বিজ্ঞানী রোমার (Ole Rømer) বছরে বছরে বৃহস্পতির একটি উপগ্রহের গ্রহণের সময়ে অদ্ভুত পার্থক্য দেখতে পেলেন। তিনি ভাবলেন, এটা কেন হচ্ছে? এটা কি এজন্য যে বৃহস্পতি পৃথিবীর থেকে অনেক দূরে এবং তাই আলো পৃথিবীতে আসতে কিছুটা সময় নিচ্ছে?

রোমার এটা নিয়ে চিন্তা করলেন এবং এখান থেকে আলোর একটা মোটামুটি বেগও বের করে ফেললেন। তার হিসেবে আলোর বেগ ছিলো 2.2*108 m/s, সেসময়ের হিসেবে অবশ্যই এরকম একটা মান বের করে ফেলাকে অসাধারণই বলতে হবে, এমনকি যখন বৃহস্পতির আকার নিয়ে তার কাছে থাকা তথ্য পুরোপুরি একুরেট ছিলো না।

এরপর আলোকরশ্মি নিয়ে আরো গবেষণা হয়েছে। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তাড়িৎচৌম্বকীয় তত্ত্ব আবিষ্কার করেন।

ম্যাক্সওয়েল তত্ত্ব অনুযায়ী, পরিবর্তনশীল তড়িৎ ক্ষেত্রের পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি করবে আবার তা থেকে তড়িৎ আবেশের ফলে তড়িৎ ক্ষেত্র নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। ফলে আবার পরবর্তিত চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হবে এবং এভাবে চলতে থাকবে। এর ফলে তাড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হবে, যেটা কোন মাধ্যম ছাড়াই চলাচলে সক্ষম হবে। শূন্য মাধ্যমে এর বেগ হবে 3*108 m/s।

এই গতি যেহেতু আলোর আনুমানিক গতির খুব কাছাকাছি, ম্যাক্সওয়েল বললেন, হতে পারে, আলো কোন তাড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ। পরবর্তীতে ম্যাক্সওয়েলের কথা সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে, আমরা আলোর সঠিক বেগ জানতে পারি।

আলো এমন একটা তরঙ্গ, যেটা কোন মাধ্যম ছাড়াই চলাচল করতে পারে। এখন চিন্তা করুন, আপনি ট্রেনে যাচ্ছেন। আপনি দেখতে পাবেন, সবকিছু পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে ট্রেনের বাহিরে কেউ, আমরা ধরে নিলাম চান্দু, যদি ট্রেনের গতির দিকে দৌড়ায়, তার আসল গতির তুলনায় আপনার কাছে তা ধীর মনে হবে। যদি সে ট্রেনের গতির উল্টোদিকে দৌড়ায়, তখন আপনার কাছে তার গতি তার প্রকৃত গতির চেয়ে বেশি মনে হবে।

বাইরের প্রকৃতিকে মাধ্যম, চান্দুকে একটা তরঙ্গ হিসেবে কল্পনা করুন। আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আপনার গতির সাপেক্ষে মাধ্যমের আপেক্ষিক গতি আছে। ফলে তরঙ্গের প্রকৃত গতির তুলনায় আপনার কাছে তা কম বা বেশি মনে হবে।

কিন্তু, আলোক তরঙ্গের জন্য যখন কোন মাধ্যমই নেই, তখন আসলে এই ঘটনাটা ঘটবে না। কারণ এখন মাধ্যম আর আপনার মধ্যে কোন আপেক্ষিক গতি নেই, কেননা, যা নেই, তার সাথে আপেক্ষিক গতি কীভাবেই বা থাকতে পারে?

আর তাই, আপনি সব সময় আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ একই রকম দেখতে পাবেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ সার্বজনীন ধ্রুবক। পর্যবেক্ষকের বেগের উপর নির্ভর করে আলোর বেগের পরিবর্তন ঘটবে না।

সবশেষে, একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ ধ্রুব।কিন্তু, মাধ্যম যদি অন্য কিছু হয়, তাহলে কিন্তু আর আলোর বেগ ধ্রুব থাকবে না। কেন থাকবে না, তা নিশ্চয়ই এখন বুঝতে সমস্যা হচ্ছে না!

সোর্স:

Series Navigation<< সময় ভ্রমণ (৩য় পর্ব): আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বসময় ভ্রমণ (৫ম পর্ব): সময়ের অপেক্ষা… >>
0 0 vote
Article Rating
Default image
তাহমিদ হাসান
এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x