বই পরিচিতি: সংবিৎ

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আসসালামু আলাইকুম। আমার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি সংবিৎ। সংবিৎ অর্থ উপলদ্ধি। হ্যাঁ, বইটিতে উপলদ্ধি করার মত অনেক কিছু আছে। লিখেছেন প্রিয় ভাই জাকারিয়া মাসুদ।

সংবিৎ

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বইটি প্রকাশিত হয়। এর কাছাকাছি সময়ে, নিরীশ্বরবাদের বিপরীতে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, প্যারাডক্সিকাল সাজিদ, আর্গুমেন্টস অফ আরজুর মত আরো বেশ কিছু চমৎকার বই প্রকাশিত হয়েছে। এ বইগুলোর সাথে সংবিৎ বইটির কিছুটা মিল পাবেন। যেমন, সাজিদ বা আরজুর মত, এখানে মূল চরিত্র ফারিস, কিন্তু ঘটনার বর্ণনা লেখকের মাধ্যমে করা হয়েছে।

সংবিৎ বইটির বিষয়বস্তুও খানিকটা নিরীশ্বরবাদের জবাবই। তবে আরেকটু বড় পরিসরে। অন্য বইগুলোতে, নিরীশ্বরবাদীদের অভিযোগগুলোর খন্ডন প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এই বইয়ে জবাব দেওয়ার সাথে তাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে ক্রিশ্চিয়ানিজম, ফেমিনিজম, মডার্নিজম বিষয়গুলোও এখানে উঠেছে।

লেখক অবতরণিকাতে বলেছেন, “ক্রমাগত রক্ষণাত্মক মনোভাব হৃদয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ঈমানী চেতনাকে ব্যহত করে। পরাজিত মানসিকতার সৃষ্টি করে।” তার আরেকটি কথা খুব মূল্যবান মনে হয়েছে, “ইদানীংকালে কেউ কেউ আমরা–জোর করে ইসলামকে বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাই। কিংবা যুক্তি দিয়ে সব কিছু বুঝিয়ে ফেলতে চাই। অথবা সালাফদের বিপরীত পথে হেঁটে, মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চাই। হয়তো আমাদের উদ্দেশ্য সৎ, কিন্তু পুরো পদ্ধতিটাই গলদ। ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে এগুলোর কোনটারই দরকার নেই।”

বইটি কেবল নিরীশ্বরবাদ বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বইটিতে মোট ১৪টি গল্প আছে। প্রথম দ্যা স্ট্যান্ডার্ড গল্পে দেখানো হয়েছে কেন মানবরচিত সংবিধান নয়, বরং আল-কুরআন আমাদের স্ট্যান্ডার্ড হবে। ডারউইনিজম: সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর শিরোনামে গল্পে ডারউইনিজম কীভাবে সন্ত্রাসবাদকে উদ্বুদ্ধ করে এবং সন্ত্রাসবাদীরা কীভাবে ডারউইনিজমকে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। পাতানো ফাঁদ এবং অভিশপ্ত সভ্যতার আর্তনাদ গল্পে মানবরচিত সংবিধান ও সভ্যতার উল্টো পিঠগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সমকামিতা বিষয়ে সমকামিতা: একটি বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধান শিরোনামে গল্প রয়েছে। হুমায়ুন আজাদ বিষয়ে বইটিতে কুম্ভিলক ও দন্ডিত অপুরুষ শিরোনামে লেখা হয়েছে। অজানা অধ্যায়ের সুসমাচার-১ ও বাইবেলের বৈপরীত্য-১ গল্পদুটি খ্রিস্টধর্ম ও মিশনারি বিষয়ে। রোজনামচা গল্পটি রাসুল (সা) কেন আমাদের জন্য আদর্শ তা নিয়ে। মতিভ্রম ও স্বপ্নলোক গল্পে কয়েকটি নাস্তিকীয় যুক্তির উত্তর দেওয়া হয়েছে। বইয়ের শেষ গল্পের নাম সংবিৎ, যেটা এই বইয়েরও নাম। বিশ্বাসের যৌক্তিকতা নিয়ে এটা চমৎকার একটি গল্প।

প্রচ্ছদ

সংবিৎ

প্রচ্ছদটি অর্থবহ এবং সুন্দর। বইয়ের সাথে সামঞ্জস্যশীল। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, প্রচ্ছদে যুক্তিবাদ, মানবধর্ম, নিরীশ্বরবাদ, ফেমিনিজম, ডারউইনিজম প্রভৃতি এক অসমাধিত ধাঁধা সৃষ্টি করেছে। ফারিস আর জাকারিয়া মাসুদ ভাইয়ের সংবিৎ গ্রন্থটি এই অসমাপ্ত ধাঁধার সমাধান।

লেখনশৈলী

সুন্দর ও সাবলীল লেখা। বেশ আবেগঘন, সুন্দর ভাষা। পরিবেশের ডিটেইলিং খুব সুন্দরভাবে করা। তাই গল্পের দৃশ্যগুলোও মনে সুন্দরভাবে এঁকে নেওয়া যায়। যেমন নদীর রূপ তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:

শরৎকালে নদী যেন একটু বেশিই রূপবতী হয়ে যায়। অবশ্যি এর জন্যে কাশফুলগুলো দায়ী। ওরা না থাকলে কি নদীর দু’পাশ এতটা সুন্দর দেখাতো? কাশফুলের সৌন্দর্য, ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা, প্রবাহমান স্রোত সবমিলিয়ে পরিবেশটা অনেক রোম্যান্টিক মনে হচ্ছে। অন্যরকম শিহরণ বোধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কল্পনার রং তুলিতে আঁকা–একেবেকে বয়ে চলা কোনো নদীর ছবি। ছবিটা অবশ্যি নিপুণ হাতে আঁকা। তাইতো সৌন্দর্য দর্শককে বিমোহিত করছে।

ছোট ছোট বাক্যের সমন্বয়ে কাহিনী সুন্দরভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে যখন সংবিৎ ও স্বপ্নলোক গল্পদুটি পড়ছিলাম, মুগ্ধতা সীমা ছাড়াচ্ছিলো। আলহামদুলিল্লাহ।

পুরো বইটি খুবই তথ্যবহুল। প্রতিটি গল্পের শেষে তথ্যসূত্রগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। বইয়ের শেষে পরিশিষ্ট অংশে চমকপ্রদ কিছু তথ্য, ছক ও ছবি যুক্ত করা হয়েছে। অনেক কিছু জানার আছে এখানে। অনেক কিছু উপলদ্ধির আছে।

ফারিস

গল্পের মূল চরিত্র ফারিস। ফারিসের চরিত্রকে লেখক এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, হৃদয়ে জায়গা করে নিবে। শুধু যুক্তি প্রদানেই ফারিসকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বইপড়ুয়া, তাক্বওয়াবান, সময়ানুবর্তী, ন্যায়নিষ্ঠ, দায়িত্ব ও ইবাদতের বিষয়ে সচেতন একজন ফারিস।

তার আবেগগুলোও হৃদয়স্পর্শী। যেমন: দ্যা স্ট্যান্ডার্ড গল্পে আসিফের সত্যকে উপলদ্ধির পর ফারিসের কথাগুলো, “সত্য এমনই, ভাইয়া। সত্য আমাদের সকলকে আকর্ষণ করে। আমাদের অন্তরকে ছুঁয়ে যায়। স্রষ্ঠা সত্যকে মেনে নেয়ার যোগ্যতা দিয়েই–আমাদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তুমি সেই সত্যের দিকেই ফিরে এসেছো। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।”

বানানরীতি

বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুসরণ করে লেখা কিছু বইয়ে বর্তমানে ঈদের পরিবর্তে ইদ এরকম বানান ব্যবহার হচ্ছে। স্বচ্ছন্দ্য পড়ার ক্ষেত্রে এই বানানগুলো একটু হলেও বাঁধা দেয় বলে বোধ করি। সংবিৎ বইয়ে বানানরীতির ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুসৃত হয় নি। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির বানানরীতি অনুসৃত হয়েছে। তবে বিদেশি শব্দে সবসময় ই-কার ব্যবহার প্রাক্টিকাল নয় বলে বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। জাকারিয়া মাসুদ ভাই অবতরণিকাতে সেটা উল্লেখ করে দিয়েছেন।

কাগজ, মুদ্রণ ও বাঁধাই

বইটি পেপারব্যাক, তবে মুদ্রণ ও বাঁধাই যথেষ্ট ভালোমানের। বইটি কোন কাগজে মুদ্রিত তা আমার জানা নেই। তবে কাগজ বেশ উন্নতমানের, মসৃণ। বর্তমানে কিছু বইয়ে উন্নত কাগজ দেওয়া হয়, যেগুলো মজবুত ও সুন্দর হলেও রং অনেকটা হলদে। আমার কিছুটা চোখে লাগে। সংবিৎ-এর প্রথম সংস্করণে কাগজ সামান্য অফহোয়াইট, তবে সেরকম হলুদাভ না। চোখের জন্য বেশ শান্তিদায়ক। দ্বিতীয় সংস্করণে আরেকটু উন্নত কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে জানলাম।

পাঠ প্রতিক্রিয়া

ফেসবুকে লেখাগুলোর অনেকগুলো জাকারিয়া মাসুদ ভাই আগেই প্রকাশ করেছিলেন। সে হিসেবে বই প্রকাশের আগেই বইয়ের অধিকাংশ পড়া হয়ে গেছে। কিন্তু বই হাতে পেয়ে পুরোটা সময় মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। মনেই হয়নি, আগেও তো পড়েছি। কিছু জিনিস আসলে পুরনো হয় না।

বইটির গল্পগুলো কয়েকবার করে পড়া হয়ে গেছে। প্রতিবারই ভালো লাগে। বিরক্তি লাগে না। তবে বইটিতে প্রতিপক্ষদের বেশ দুর্বল মনে হয়েছে। প্রতিপক্ষ থেকে কখনোই শক্ত কোন যুক্তি আসেনি। যেমন, অজানা অধ্যায়ের সুসমাচার ও বাইবেলের বৈপরীত্ব গল্পে প্রতিপক্ষ মাইকেলকে দেখা যায়, আলোচ্য অধ্যায়গুলোর অধিকাংশ সে আগে জানতো না। অবশ্য জাকারিয়া ভাই ফেসবুক পেজে বলেছেন, “প্রতিপক্ষ আরেকটু সবল হলে ভালো হতো। হ্যাঁ, আমরাও তাই চাই। ইনশাআল্লাহ আগামী দিনগুলোতে শক্তিশালি প্রতিপক্ষের সাথে ফারিসের কথপোকথন হবে। দোয়া চাই।”

প্রোমো

এক নজরে

  • বই: সংবিৎ
  • লেখক: জাকারিয়া মাসুদ
  • সম্পাদনা: আশিক আরমান নিলয়
  • শার‌‌‌’ঈ সম্পাদনা: শাইখ হারুন ইযহার
  • বিষয়: নাস্তিক্যবাদের জবাব
  • পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২২৪
  • মুদ্রিত মূল্য: ২৮৪ টাকা
  • প্রকাশনী: সমর্পন প্রকাশন
  • প্রকাশক: রোকন উদ্দীন

প্রাপ্তিস্থান

বিভিন্ন জেলা ও অনলাইনে সংবিৎ-এর প্রাপ্তিস্থানগুলো এখানে দেখুন। আমি বইটি খিদমাহশপথেকে কিনেছিলাম। বর্তমানে তাদের কাছে বইটি ২১৩ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

0 0 vote
Article Rating
Default image
তাহমিদ হাসান
এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x