শনির বলয়নামা: যা জানলে আপনি আশ্চর্য হবেন

আজ থেকে ৪০০ বছর আগে, ১৬১০ সালে মহান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপে মহাকাশে কানের মত আকৃতির একটা গ্রহ দেখতে পান। তার টেলিস্কোপ তো খুব শক্তিশালী ছিলো না, তাই তিনি আসলে বুঝতে পারেননি, বলয়সহ শনি গ্রহকেই ওরকম দেখাচ্ছে।

গ্যালিলিও গ্যালিলি

তার কিছু বছর পরে, ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইজেনস আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপে গ্রহটি দেখেন। তিনিই প্রথম বলেন, শনির সমতল এবং প্রশস্ত বলয় আছে।

এরকম বলয় বা রিং যে শুধু শনিরই আছে তা কিন্তু নয়! সৌরজগতের অন্যান্য গ্যাসীয় গ্রহ, অর্থাৎ বৃহস্পতি, ইউরেনাস, আর নেপচুনেরও এরকম বলয় আছে। কিন্তু সেগুলো শনির মত বড় আর উজ্জল নয়।

শনির বলয়

বৃহস্পতির পর সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ এবং সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে শনি ষষ্ঠ। শনির আকার আসলেই বিশাল! এই গ্যাসদানব গ্রহের মধ্যে আমাদের পৃথিবীর মত গ্রহ ৭৪০ টির বেশি ধরে যাবে! তবে ভরের দিক দিয়ে সে তুলনায় অনেকটা কম, পৃথিবীর ৯৫ গুণ। মজার বিষয় হলো, একারণে গ্যাসদানবটির ঘনত্বও কিন্তু খুবই কম। যদি সেরকম বিশাল জলাধার পাওয়া যায়, এবং সেখানে শনিকে ফেলে দেওয়া হয়, তবে এটা ভেসে থাকবে!

সৌরজগতের আর সব গ্যাসদানবের মতই এর রিং আছে। তবে উজ্জলতা আর আকার একে সবার থেকে আলাদা করেছে। এই রিংগুলো কিন্তু পাথর আর বরফের টুকরো বাদে কিছুই নয়! ঘন্টায় ১১০০ মাইল পর্যন্ত বেগে ঘূর্ণায়মান বাতাসে রিংগুলো শনিকে চক্কর দিচ্ছে

গঠন

আবিষ্কারের পরবর্তীতে আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে দেখে আবিষ্কার করেন, আসলে একটি নয়, শনির অনেকগুলো বলয়। এরা পাথর এবং বরফে তৈরি যেগুলোর কোনটি হয়তো এককণা বালুর মত, আবার কোনটি পুরো একটা দালানের সমান। এতে বরফই সবচেয়ে বেশি, এটাই কিন্তু একে এত উজ্জল দেখানোর কারণ!।

তবে, এখনও আমরা জানি না, বলয়গুলো ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছিলো। তবে, বিজ্ঞানীদের ধারণা, শনির অনেক উপগ্রহ থাকার সাথে এর কানেকশন আছে। শনির উপগ্রহের সংখ্যা অন্ততপক্ষে ৬০ টি। যেগুলো কখনো গ্রহাণু বা উল্কার ধাক্কায় টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

অনেকে মনে করেন, বলয়গুলোর সৃষ্টি হয়েছে ধূমকেতু, ভাঙা উপগ্রহ আর গ্রহাণুর ধ্বংসাবশেষে। কিংবা আরো হতে পারে, এগুলো তৈরি হয়েছে তখনই যখন শনির গঠন হয়েছিলো, যদিও, সর্বশেষ তথ্য তা বলছে না, সে কথায় পরে আসছি।

সংখ্যা ও আকার

Closeup of Saturn rings

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বড় রিংগুলো ছোট ছোট রিংয়ের সমষ্টি
Credits: NASA/JPL/Space Science Institute

দূর থেকে যদিও শনির সাতটি বলয়ের দেখা পাওয়া যায়, কিন্তু কাছ থেকে যদি দেখলে দেখা যাবে অনেকগুলো ছোট ছোট রিং মিলে এই রিংগুলো বানিয়েছে। অনেক সময় ছোট রিংগুলোকে রিংলেট বলা হয়।

রিংগুলোর বিস্তার অনেক, তবে পুরুত্বের দিক দিয়ে রিংগুলো খুবই পাতলা, মাত্র ৩০ থেকে ৩০০ ফিট, গড়ে ৬৬ ফিট।

২০১৫ সালে গবেষকরা জানিয়েছেন, শনির চারপাশে একটি জায়ান্ট রিং রয়েছে, যেটা আসলে অনেক অনেক বড়, ব্যাস গ্রহটির প্রায় ৭০০০ গুণ! গবেষণার প্রধান, মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির প্লানেটারী বিজ্ঞানী ডগলাস হ্যামিল্টন স্পেস.কমকে বলেন, আমরা এটিকে সবচেয়ে বড় রিং জানতাম, কিন্তু এখন দেখছি এটা এমনকি আমাদের ভাবনার চেয়ে বড়।

তার মতে, এই রিংটি থাকার বিষয়টি চমকপ্রদ। তিনি বলেন, পাঠ্যবইগুলোতে আমরা বলি, গ্রহের রিংগুলো ছোট এবং তাদের প্যারেন্ট প্লানেটের কাছাকাছি থাকে, যদি তারা আরো দূরে চলে যায়, রিংয়ের পরিবর্তে উপগ্রহ তৈরি হবে।

তবে এই রিংটি সে সাক্ষ্য দিচ্ছে না। তাই, তার কথায়, এই আবিষ্কার ধারণা দেয়, এই মহাবিশ্ব অনেক বেশি ইন্টেরেস্টিং এবং সারপ্রাইজিং।

Biggest Ring Around Saturn Just Got Supersized

শিল্পীর কল্পনায় এখানে দেখানো হয়েছে ইনফ্রারেড আলোতে কিভাবে শনির জায়ান্ট রিং দেখা যাবে
Credit: NASA/JPL/Space Science Institute

উৎপত্তি

কেউ কেউ বিশ্বাস করতো, আজ থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে যখন শনির জন্ম হয়েছিলো, তখন সৌরজগত তৈরিতে অবশিষ্ট বরফাচ্ছন্ন ধ্বংসাবশেষগুলো থেকে রিংগুলো তৈরি। কিন্তু এখন আমরা নতুন তথ্য জানি।

ক্যাসিনি স্পেসক্রাফট (এ বিষয়ে পরে থাকছে) যখন তার ২০ বছরের ভ্রমণ শেষ করার জন্য শনির এটমোসফিয়ারে ডুব দেয়, তখন সে বলয় ও শনির মাঝে পৌছে যায়। শেষ সময়ে সে তার ইন্সট্রুমেন্টের সাহায্যে শনির বলয়ের উপাদানের ভর পরিমাপ করে ফেলে। আর এ থেকে বিজ্ঞানীরা বলয়ের বয়সও নির্ণয় করতে পারে।

বর্তমান ধারণা হলো, শনির বলয়ের সূচনা মাত্র ১০ কোটি বছর পূর্বে, এইতো সেদিন, যখন ট্রাইনোসরাস রেক্সরা পৃথিবীতে চড়ে বেড়াতো। এমনকি হতে পারে মাত্র ১ কোটি বছর আগে। আর এখন বলয়গুলো আছে নিজের জীবনের মধ্যভাগে। হ্যাঁ, মানে শনির বলয়েরও সময় শেষ হয়ে আসছে।

লেখাটি ভালো লাগছে? তাহলে এটিও দেখুন: মহাবিশ্বের বিশালতা: আপনার কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি

হারিয়ে যাবে

মহাকাশের ক্যানভাসে এই বলয়গুলো অপরূপ সৌন্দর্য। আর এগুলোই শনির ট্রেডমার্ক। তাই বলয়গুলো ছাড়া, শনি আসলে শনি থাকবে না, শনির স্পেশালিটি থাকবে না।

কিন্তু, নশ্বর জগতে, শনির বলয়েরও চিরকাল থাকার সুযোগ নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কয়েক কোটি বছরের এই সময়ের মধ্যেই শনির দৃষ্টিনন্দন বলয়গুলো হারিয়ে যাবে।

হয়ত এটাই ঘটবে শনির সাথে

আগের বছরের শুরুতে স্পেসক্রাফট ক্যাসিনি বলয় থেকে গ্রহটিতে একরকম বৃষ্টি দেখতে পায়। মূলত, শনির বলয়ের বেশিরভাগই বরফ এবং এই বরফগুলোই গ্রহে বৃষ্টির সৃষ্টি করছে। ফলে, ধীরে ধীরে বলয়গুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

এজন্য, খুব বেশিদিন আর শনির বলয়ের হায়াত না-ও থাকতে পারে। এমনকি হতে পারে যদি কিয়ামত ততদিন না আসে, আমাদের মাত্র ১০ কোটি বছর পরে যারা আসবে, তারা এই বলয়গুলো দেখতে পাবে না। সময়টা কিন্তু খুব বেশি না!

শনিতে অভিযান

খুশিতে ঠেলায় ভাল্লাগে ঘোরতে প্রথম শনিতে পৌছেছিলো পাইওনিয়র ১১, সময় তখন ১৯৭৯ সাল। শনির সাথে ২২,০০০ কি.মি. দূরত্বের মধ্য দিয়ে এটি উড়েছিলো। এটি গ্রহের বাইরের দুটি রিং আবিষ্কার করে আর শনির শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করে। এরপর ভয়েজার গিয়ে দেখে আসে, বড় রিংগুলো রিংলেটের সমষ্টি। তার পাঠানো তথ্য থেকে শনির ৯টি চাঁদ শনাক্ত হয়।

Cassini Saturn Orbit Insertion.jpg
শিল্পীর তুলিতে ক্যাসিনি
NASA/JPL [Public domain], via Wikimedia Commons

এরপর ২০০৪ সালে সেখানে ঘুরতে যায় ক্যাসিনি, যেটা ছিল গ্রহান্তরে যাওয়া সবচেয়ে বড় স্পেসক্রাফট। ৬ টন দানবটি ওজনে ৩০ টি স্কুলবাসের সমান। শনির চাঁদ এনসেলাডাসে শিখা দেখতে পায় এবং আরেকটি স্পেসক্রাফট হাইজেনসকে টাইটানে পৌছে দেয়।

এক যুগের বেশি অবজার্ভেশনে সে মঙ্গল বিষয়ে প্রচুর তথ্য পাঠায়, এই লেখার জন্যও তাকে ধন্যবাদ দিতে হবে। এরপর ২০১৭ সালে, জ্বালানি ফুরিয়ে এলে ধ্বংসের জন্যই সে শনির দিকে ঝাঁপ দেয়। এভাবেই তার বর্ণাঢ্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে!

Huygens probe dsc03686.jpg
হাইজেনস By David Monniaux – Own work, CC BY-SA 3.0, Link

সহায়তা

এবং অবশ্যই সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলো ডাকডাকগো, গুগল এবং গুগল ট্রান্সলেট। আর ব্যবহৃত পাবলিক ডোমেইন ছবির জন্য Pixabay আর Wikimedia কে ধন্যবাদ। এবং ধন্যবাদ তাহমিদ বোরহান ভাইকে।

0 0 vote
Article Rating
Default image
তাহমিদ হাসান
এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?
Subscribe
Notify of
guest
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
তাহমিদ বোরহান
তাহমিদ বোরহান
1 year ago

অসাধারণ!
তবে লেখাটা আরো ন্যাচারাল করতে হবে, এখনো কেমন যেনো একটু আধটু রোবোটিক ভাব রয়েছে লেখায়!

শনির রিং এর বেশিরভাগ অংশই আইসে তৈরি, এই জন্যই তো পথিবী থেকেও এত জ্বলজ্বল করে এর বলয় দেখা যায়। সোলার উইন্ড এর ফলে এগুলো গলে শনিতে খসে পড়ছে। আর রিং হারিয়ে গেলে শনি মোটেও আর স্পেশাল থাকবে না।

SANDIP DAS
SANDIP DAS
5 months ago

শনির ভর পৃথিবীর 95 গুণ নয়, 95 ভাগ৷
লেখনীটি অসাধারণ৷

4
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x