মেরু ভালুকের জানা অজানা

এটা আমরা সবাই জানি, মেরু ভালুক হিমশীতল পরিবেশে বাস করে এবং তাদের বর্ণ সাদা। কিন্তু মজার বিষয় হলো, তাদের বর্ণ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সাদা নয়। বরং তাদের ত্বক কালো এবং তাদের লোম স্বচ্ছ। তাহলে তাদের সাদা কেন দেখায়? এর কারণ হলো, তাদের স্বচ্ছ লোম আলোর প্রতিফলন ঘটায় এবং একারণেই এদের বর্ণ সাদা দেখায়।

মেরু ভালুক পরিবার

মেরু ভালুকের বৈজ্ঞানিক নাম Ursus maritimus, এবং আমরা জানি বৈজ্ঞানিক নাম অবশ্যই এটা ল্যাটিন ভাষায় হয়। ল্যাটিন Ursus অর্থ ভালুক এবং maritimus অর্থ উপকূলবর্তী বা সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত। তারা একমাত্র ভালুক প্রজাতি যাদের সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী ধরা হয়। কিন্তু, ভালুক কিভাবে সামুদ্রিক হয়? আসলে তারা জীবনের অধিকাংশ সময় সাগরের বরফে কাটায় এবং তারা সাঁতারেও দক্ষ।

মেরু ভালুক সামুদ্রিক

ঘন্টার পর ঘন্টা এমনকি দিনের পর দিন তারা সাঁতার কেটে যেতে পারে। আপনি হয়ত ভাবতে পারেন এটা শুধু মাছের জন্যই সম্ভব, কারণ মানুষের জন্য দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটা সহজ নয়। কিন্তু মেরু ভালুকেরা পারে কারণ তাদের রয়েছে বিশাল থাবা যা তারা বৈঠার মত কাজে লাগায়। আর পা-কে রাডারের মত ব্যবহার করে তারা শক্তি সাশ্রয় করে ক্লান্তি ছাড়া দীর্ঘক্ষণ পানিতে থাকতে পারে। এদের সাঁতারের গতি ঘন্টায় ৬ মাইল পর্যন্ত হতে পারে।

মেরু ভালুক সাঁতার

উত্তর আমেরিকা, ইউরেশিয়া অর্থাৎ ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশ; প্রধানত উত্তরের সুমেরুবৃত্তের চারপাশে এদের দেখা যায়। তবে আলাস্কা এবং কানাডার হাডসন বে পর্যন্ত-ও এদের দেখা গেছে। শীতে তারা বরফে অথবা বরফের কাছাকাছি থাকে, তবে শীত শেষে নিজ নিজ চারণভূমিতে ফিরে আসে।

বাসস্থান উত্তর মেরু

বছরে খাদ্য সরবারহের খোঁজে তারা ১৮০০ মাইলের বেশি পাড়ি দিতে পারে। চলার পথে ১৯ ফুট পর্যন্ত বরফের ফাটল তারা লাফিয়ে অতিক্রম করতে পারে। তাদের লোমশ চরণযুগল শুধু তাদের গরমই রাখে না চলার সময় ক্ষুদ্র লোমগুলো বরফের উপর ট্র্যাকশন পেতে সাহায্য করে।

ত্বকের রং কালো

জীবনের অর্ধেক তারা খাদ্য সন্ধানে কাটিয়ে দেয়, তবে সফল কমই হয়। কখনো এরা শিকার ধরায় ২% এর বেশি সফল না। এদের শিকারের মধ্যে আছে সিল, পাখি এসব। দরকার পড়লে এরা মৃত পশু, ডিম, শাকসব্জিও খেতে পারে। এজন্য এদের হাইপারকার্নিভরস বলা হয়। এর অর্থ হলো, এদের খাদ্যাভ্যাসে ৭০% এর বেশি মাংস।

মেরু ভালুক

প্রখর ঘ্রাণশক্তির কারণে ১ কিলোমিটার দূর থেকেও এরা শিকারের গন্ধ পেতে পারে। সিল শিকারের সময় এরা সিলের গর্ত খুঁজে অপেক্ষা করে। সিল যখন শ্বাস নিতে উঠে আসে তখন আক্রমণ করে। বরফের ৩ ফুট গভীরে থাকা সিলের অস্তিত্বও এরা বুঝতে পারে। ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূর থেকে এবং সর্বোচ্চ ঘন্টায় ৪০ কি.মি গতিতে এরা আক্রমণে সক্ষম।

মেরু ভালুক

গ্রোলার/পিজলি ভালুক নামে এক ধরণের ভালুক রয়েছে, যারা সব দিক দিয়ে মেরু ভালুকের মতই তবে রং বাদামি। ২০০৬ সালে জেনেটিক পরীক্ষা করে জানা গেছে এরা গ্রিজলি ভালুক ও মেরু ভালুকের সংকর।

Grollar Bear
By Brocken Inaglory, CC BY-SA 3.0, Link

মদ্দা প্রাণীরা ওজনে প্রায় ৮০০ কেজি, ১০-১২ জন মানুষের সমান। উচ্চতায় প্রায় ৯.৮ ফুট, যা তাদের শ্বাপদ বর্গের সবচেয়ে বড় প্রাণী করেছে। তবে মাদী মেরু ভালুকরা আকারে প্রায় অর্ধেক। নর্থ ওয়েস্টার আলাস্কায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মেরু ভালুকটি পাওয়া গেছিলো ১৯৬০ সালে, ওজন ১০০২ কিলোগ্রাম।

মেরু ভালুক

গর্ভবতী না হলে, একমাত্র ভালুকের প্রজাতি হিসেবে এরা হাইবারনেশন বা শীতনিদ্রায় যায় না। তবে অতিশয় শীতের ক্ষেত্রে তারা সাময়িক শীতনিদ্রায় যেতে পারে যাকে carnivore lethargy (শ্বাপদ তন্দ্রা) বলা হয়।

মেরু ভালুক

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সংকটাপন্ন হওয়া প্রাণীগুলোর প্রথমদিকের একটি এরা। আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে। একারণে আর অনেক প্রভাবের মত এদের উপরেও প্রভাব পড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এদের সংখ্যা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ভালো লাগলে এটিও দেখুন: এক ধরণের কুকুর হলেও ডিঙ্গো ইন্টারেস্টিং, কেন?

সোর্স:

About the Author: তাহমিদ হাসান

এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?

You May Also Like

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of