ফিডোরা: হতাশা-আশা-হতাশা

যদিও আমি নিয়মিত বিভিন্ন ডিস্ট্রোর স্বাদ নিই, তবে ফিডোরাসহ RPM বেজড ডিস্ট্রোগুলোর অভিজ্ঞতা আগে তেমন নেওয়া হয়নি। অবশ্য একবার ফিডোরা ইন্সটল দিয়েছিলাম আগে, কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য। সত্যি বলতে, তখন তেমন পছন্দ হয়নি। তবে, পছন্দ করার মত খুব বেশি সময়ও কাটাইনি, এটাও ঠিক।

তাই, বেশ কিছুদিন একটু ভালোভাবে ফিডোরার অভিজ্ঞতার জন্য আরো একবার ইন্সটল দিলাম। আর ফিডোরা রিভিউ করতেও দুএকজন বলেছিলেন।

ফিডোরার বেশ কয়েকটি স্পিন আছে। তবে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ ইউজারদের জন্য তাদের মূল ফোকাস ফিডোরা ওয়ার্কস্টেশনে গ্নোম ডেস্কটপ রয়েছে বাই ডিফল্ট। আমিও এটিই নামিয়েছিলাম। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিলো, ফিডোরার পিওর অভিজ্ঞতা নেওয়া। যেকারণে শুধু সেটিংসে যুক্ত অপশনগুলো (যেমন- ওয়ালপেপার) বাদে কোন প্রকার কাস্টমাইজেশন থেকে বিরত থেকেছি।

ফিডোরা স্টক এক্সপ্রেরিয়েন্স প্রোভাইড করে। যেমন, আমি যদি উবুন্টুর সাথে তুলনা করি, উবুন্টুতে গ্নোম ডেস্কটপ বেশ ভালোভাবে কাস্টমাইজড। তাদের নিজস্ব ডক, চমৎকার থিম ও আইকন প্যাক রয়েছে। তারা ডেস্কটপ আইকন, মিনিমাইজ বাটন প্রভৃতি যুক্ত করেছে যেটা গ্নোম ডেস্কটপে বর্তমানে থাকে না। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ননফ্রি ড্রাইভার ইন্সটল করে নেওয়া উবুন্টুতে সহজ।

সেখানে ফিডোরা একদমই পিওর গ্নোমের স্বাদ (মশলা কম) দিবে। একদম প্রথমে ফিডোরা দেখতে এরকম। সাদামাটা একটা ডেস্কটপ। শুধু উপরে একটা প্যানেল দেখা যাবে। এটুকুই। তাছাড়া, ডেস্কটপে আইকন যুক্ত করারও বাই ডিফল্ট সুযোগ নেই।

অনেস্টলি, প্রথম দেখায় ভালো লেগে যাওয়ার মত কিছু এখানে চোখে পড়েনি। বিশেষ করে, ওয়ালপেপারের গুরুত্ব খানিকটা হলেও আছে। ফিডোরাতে সুন্দর কিছু ওয়ালপেপার সংযুক্ত আছে। অন্য কোনটা ডিফল্ট রাখলে মনে হয় সুন্দর দেখাতো।

আমি আশা করছিলাম, এরকম সাদামাটা একটা ডেস্কটপ উবুন্টু থেকে কিছুটা কম রিসোর্স নিবে। কিন্তু পিসি চালু হওয়ার পর কোন অ্যাপ চালু না থাকলেও র‌্যাম ব্যবহার প্রায় ১.২-১.৩ জিবি। যেটা বেশ ভালো একটা অ্যামাউন্ট।

তবে মজার বিষয় হলো, কিছুক্ষণ পিসি চালানোর পর তা অনেকটা কমে যাচ্ছে। সাধারণত, উল্টোটা অনেকসময় দেখা যায়। জানি না, এর কারণ কী। হতে পারে স্টার্টআপ অ্যাপগুলো চালু করতে কিছুটা রিসোর্স দরকার হয়।

একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কী? সিস্টেম মনিটর অ্যাপটাতে শুধুমাত্র ক্লোজ বাটনটি দেখাচ্ছে। আমাদের অতি পরিচিত মিনিমাইজ, ম্যাক্সিমাইজ বাটন দুটি নেই। এই দুটি কিছু টুইক করে যুক্ত করে নেওয়া সম্ভব, তবে আমি কিছুক্ষণ চালিয়ে অনুধাবন করলাম, আসলে গ্নোমে এর খুব বেশি প্রয়োজন নেই।

গ্নোমের ডেস্কটপ প্রথম দেখায় সাদামাটা হলেও, এর আসল সৌন্দর্য্য লুকিয়ে আছে Activities অংশে। ডেস্কটপের উপরে বাম কোনাতে Activities বাটন রয়েছে, এ ছাড়া হট কর্নারও এনাবল করা, অর্থাৎ উপরে বাম কোনায় মাউস নিয়ে গেলেই এটা চলে আসবে। ক্লিক করতে হবে না।

এখানে আপনি প্রয়োজনীয় সংখ্যক ওয়ার্কস্পেসে চলমান অ্যাপগুলোকে সাজিয়ে রাখতে পারবেন। এতে অভ্যস্থ হয়ে গেলে মিনিমাইজ বাটনের প্রয়োজন হবে না। প্রথমে একটু সমস্যা হলেও, এরপর এর অভাব আমি একদমই ফিল করছি না।

আর ম্যাক্সিমাইজ বাটনটা অন্য ওএসেও খুব একটা কাজে লাগে না। কারণ, সাধারণত ডাবল ক্লিক করেই এর কাজ করা যায়। আর তাছাড়া, উইন্ডো স্ন্যাপিং ফিচারও আছে। টাইটেলবারকে টেনে উপরে নিয়ে গেলে ফুল স্ক্রিন, ডানে বা বামে নিয়ে গেলে অর্ধেক স্ক্রিনে রিসাইজ হয়ে যায়। আবার নিচে টেনে আনলে সাধারণ সাইজে আসে। অতএব, এই বাটন থাকা-না থাকায় তেমন কিছু যায় আসে না।

অ্যাপের কথা যদি বলি, বেসিক অ্যাপ, যেমন, ফায়ারফক্স, রিদমবক্স, লিব্রে অফিস প্রভৃতি যুক্ত আছে। এছাড়া গ্নোমের ডিফল্ট বিভিন্ন অ্যাপ যেমন, ক্যালেন্ডার, ক্লক, কন্টাক্টস, ফাইলস (নটিলাস), ম্যাপস, ক্যালকুলেটর, সফটওয়্যার, টেক্সট এডিটর (Gedit) এসব তো আছেই। এর সাথে ভার্চুয়ালাইজেশনের জন্য Gnome Boxes যুক্ত করে দিয়েছে দেখলাম। তবে, বলে রাখি, GIMP যুক্ত ছিলো না, আমি ইন্সটল করেছি।

সফটওয়্যার ইন্সটলে উবুন্টুর চেয়ে কিছুটা পার্থক্য থাকবে, কারণ এটা ডেবিয়ান ভিত্তিক না, RPM ভিত্তিক। ফিডোরাতে সম্ভবত রিপোজিটরীতে শুধুমাত্র ওপেন সোর্স অ্যাপগুলোই আছে। তার সাথে ফ্লাটপ্যাক সাপোর্টও বাই ডিফল্ট আছে।

সফটওয়্যার সেন্টার থেকে সহজেই অ্যাপগুলো ইন্সটল করা যায়, পদ্ধতি উবুন্টুর মতই, কারণ এখানেও আছে গ্নোম সফটওয়্যার। আর টার্মিনাল থেকে ইন্সটলের জন্য sudo dnf install package_name এভাবে কমান্ড দিলেই হবে। আর উবুন্টুর .deb ফাইলের মত এখানে .rpm ফাইল ডাউনলোড করে ইন্সটল করা যায় সহজেই। বিস্তারিত জানতে চাইলে একটি আর্টিকেল সংযুক্ত করে দিলাম।

এতক্ষণ অনেক ভালো ভলো কথা বললাম। দুই তিনদিন পর্যন্ত ফিডোরা আমার কাছেও ভালো ছিলো। কিন্তু তারপর, আমি হতাশ।

২ জিবি র‌্যামে গ্নোম দৌড়াবেনা, স্বাভাবিক। তবে এমনিতে স্মূথই ছিলো, একটু ল্যাগ করছিলো, ভালো হার্ডওয়্যার নেই, মেনে নিতেই হবে। তবে কখনো কয়েক মিনিটের জন্য আটকে যাচ্ছিলো। একবার তো, রিস্টার্ট না দেওয়া পর্যন্ত ঠিক হলো না। যাই হোক, আমার কনফিগারেশন অনুযায়ী, মেনে নেওয়া যায়। তবে, এরপরের সমস্যাটা মেনে নেওয়ার মত না।

গ্নোম শেলে গেলে প্রায়ই কার্সর হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, যেটা প্রচন্ড বিরক্তিকর। কোন অ্যাপ, যেমন, ফায়ারফক্স, টার্মিনালে কোন সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু উপরের প্যানেল, এক্টিভিটিস অংশ বা ডেস্কটপে কার্সর দেখা যাচ্ছে না, মানে কাজ করছে, কিন্তু কার্সর দেখাচ্ছে না। একবার দুবার না বারবার এটা হচ্ছে।

সার্চ করে দেখলাম, শুধু আমার না, এই সমস্যা অনেকেরই (এখানে দেখুন)। ফিডোরা না চালানোর কারণ হিসেবে এটা যথেষ্ট। প্রথমে এই সমস্যা পাইনি। আপডেট করার পর থেকে হচ্ছে। এক্টিভিটিসে থাকলে সার্চ বক্সে অথবা অন্য কোন অ্যাপ থেকে প্যানেলে গিয়ে ক্লিক করলে ঠিক হচ্ছে।

এটা হয়ত, পরে ঠিক হয়ে যাবে। তবে, এটা একটা উদাহরণ যে, ফিডোরা যথেষ্ট স্ট্যাবল না। আপনি হয়ত জানেন, ফিডোরা রেডহ্যাটের আপস্ট্রিম কমিউনিটি ভিত্তিক ওএস। নতুন ফিচারগুলো আগে ফিডোরাতে পরীক্ষা করা হয়, এবং একারণে রেডহ্যাট স্ট্যাবল হলেও ফিডোরাতে এরকম সমস্যা প্রায়ই থাকে।

এরপরের দুঃখের কথায় আসি, এটাকে অবশ্য ফিডোরার দোষ হিসেবে দেখছি না। কারণ তারা সম্ভবত পিওর ওপেন সোর্স থাকতে চায়। আর এই বিষয়টা পিওর ওপেনসোর্স প্রেমীদের হয়ত ভালোই লাগবে।

যাইহোক, এমনিতে এতে .mp4 সহ বিভিন্ন মিডিয়া ফাইল চালানো যাবে না। এটা হয়ত একারণে যে, ফিডোরা সাধারণভাবে প্রপ্রাইটরি ড্রাইভার ও সফটওয়্যারগুলো প্রভাইড করে না। তারা ডিকোডার ইন্সটল করতে বলে নিচের ছবির মত বক্স দেখালো। তো, ফাইন্ড ইন সফটওয়্যারে গেলে তিনটি ডিকোডার দেখালো, যার প্রথম দুটি ইন্সটল করাই ছিলো। তৃতীয়টিও ইন্সটল করলাম, কাজ হলো না।

এরপর ভাবলাম, ভিএলসি ইন্সটল করি, কমান্ড দিলাম, sudo dnf install vlc। কিন্তু vlc নামে নাকি কিছু নেই। সফটওয়্যার সেন্টারেও খুঁজে পাওয়া গেলো না। বুঝলাম, এটিও তাদের রিপোজিটরীতে নেই। সম্ভবত ভিএলসিতে কিছু প্রপ্রাইটরি জিনিস সংযুক্ত আছে বলে।

এই দুটি ঘটনার সমাধান সিম্পল, RPM Fusion এনাবল করে নিলেই হবে। এরপর ভিডিওস থেকে ফাইন্ড ইন সফটওয়্যারে গেলে ননফ্রি ডিকোডারগুলো পাওয়া যাবে। ইন্সটল করে নিলেই MP4 ফাইল চলবে। এরসাথে ভিএলসিও উপরে দেওয়া কমান্ড দিয়ে বা সফটওয়্যার সেন্টার থেকে ইন্সটল করা যাবে। তবুও এটা রিপোজিটরিতে না থাকাটা কেমন যেন লেগেছে।

সব মিলিয়ে, ফিডোরা আমার মন জয় করতে পারেনি। তবে হ্যাঁ, পিওর গ্নোমের অভিজ্ঞতা আসলেই একটু অন্যরকম। এদিক দিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে।

About the Author: তাহমিদ হাসান

এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?

You May Also Like

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of