রংপুরের ভিন্নজগতের প্লানেটরিয়াম, ঢাকার নভোথিয়েটার আর কিছু হতাশার গল্প

ঢাকার নভোথিয়েটারে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তিনবার। প্রথম দুবার গেছিলাম ভাসানি নভোথিয়েটারে, দশ-বারো বছর আগের কথা। তৃতীয়বার যাওয়ারও কয়েক বছর হয়ে গেছে, সেবার গিয়ে দেখি ভাসানি নভোথিয়েটার হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নভোথিয়েটার, সাথে প্রবেশ টিকিট ৫০ টাকা থেকে হয়েছে ১০০ টাকা। নভোথিয়েটার আইন ২০১০ এর মাধ্যমে এই নাম প্রয়োগ করা হয়। আইনটি এখানে দেখে নিতে পারেন।

এই আইনে বলা হয়েছে, “ঢাকা আধুনিক নভোথিয়েটার প্রকল্পের অধীন প্রতিষ্ঠিত নভোথিয়েটার এই আইন কার্যকর হইবার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নভোথিয়েটার নামে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবে।” তার মানে আমি আসলে কখনোই ভাসানি নভোথিয়েটারে যাইনি, এটা সবসময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নভোথিয়েটার হিসেবেই ছিলো। আচ্ছা, মেনে নিলাম 😶 আরেকটা কথা, উপরের উদ্ধৃতি চিহ্নের অংশটুকু কপি করতে গিয়ে দেখি বাংলাদেশের একমাত্র প্রমিত মান বিজয় কীবোর্ড ৩.০ দিয়ে লেখা হয়েছে। কী আর করা! টাইপ করতে হলো।

অনেকেই হয়ত জানেন, এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্লানেটরিয়াম। ওয়েবসাইটেও এরূপ লেখা রয়েছে। তবে এটা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাংলাদেশে অন্ততপক্ষে আরো একটি প্লানেটরিয়াম আছে, রংপুরের ভিন্নজগতে। বছর দুতিন আগে সেখানে একবার ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিলো। এটা সত্য যে, প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সেটি এর ধারেকাছেও নয়। তবে, আরো কথা আছে, সে কথায় পরে আসি, রংপুরের ভিন্নজগতের প্লানেটরিয়াম নিয়ে একটু কথা বলি।

ভিন্নজগৎ মূলত একটি শিশু পার্ক ও পিকনিক স্পট। এখানে অনেক কিছুর ‘মিনি’ ভার্সনের দেখা পাবেন। যেমন আসলের আদলে তৈরি চীনের মহাপ্রাচীর, আইফেল টাওয়ার, মস্কোর ঘন্টা, পিরামিড, তাজমহল এখানে রয়েছে। রয়েছে একটি ছোটখাট চিড়িয়াখানাও, আরও আছে বরফের ঘর ‘ঈগলু’-র আদলে একটি ঘর। এবং অবশ্যই একটি প্লানেটরিয়াম। এখানে প্রবেশমূল্য তখন ছিলো খুব সম্ভব ৩০ টাকা এবং ‘সৌরজগৎ’ নামের ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হচ্ছিলো।

প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এটা তত চমকপ্রদ কিছু না। উপরে একটি গোলাকার পর্দা এবং এক কোণায় একটি রোটেটেবল প্রজেক্টর। প্রজেক্টরটি খুব বিশেষ কিছু মনে হলো না, একসাথে পুরো পর্দাকে কভার করে না, ঘুরে ঘুরে দেখায়। তাছাড়া, ছবিও গোল পর্দার উপযুক্ত মনে হয়নি, বেঁকে যাচ্ছিলো। অবশ্য একবার তারকা (ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ আলোর মত) পুরো স্ক্রিনজুড়ে দেখানো হয়, আর প্রথদদিকে বিস্ফোরণ বোঝাতে পুরো স্ক্রিনে বিভিন্ন আলোর খেলা দেখানো হয়। আমি নিশ্চিত নই সেক্ষেত্রে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

ঢাকার নভোথিয়েটারের মত মুগ্ধতা ছড়ায়নি এই প্লানেটরিয়াম, এটা এয়ার কনডিশনডও নয়। নিতে মেঝেতে বেশ সাধারণ মানের চেয়ার গোল করে রাখা। অযত্নের একটা ছাপ, ধুলোবালি এমনকি মাকড়সার জালেরও দেখা মিলে।

ভয়েসে যদ্দুর মনে পড়ে, জায়েদ ইকবাল-ই নাম বলা হয়েছিলো, যিনি ঢাকার নভোথিয়েটারের ডকুমেন্টারিরও ভয়েস দিয়েছেন। উপস্থাপন ও কন্ঠ আমার মতে প্লানেটরিয়াম হিসেবে বেশ মানানসই। তবে চারিদিকে হইচই, ছবি তোলা সবকিছুর মাঝে কথা শোনাও কিছুটা কঠিন।

সব মিলিয়ে প্লানেটরিয়াম বললে ফিউচারিস্টিক একটা অনুভূতি যে মাথায় আসে, তার কিছুই এখানে নেই। হতাশ হওয়ার কথা, কিন্তু আসলে হইনি। কেননা, একটি পার্কের ভেতর এরকম একটি প্লানেটরিয়াম থাকাটাই আশ্চর্যজনক, এানে থেকে বেশি কিছু একদমই আশা করিনি। তবে এর চেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা ছিলো বঙ্গবনধু শেখ মুজিবর রহমান নভোথিয়েটারে যেবার সর্বশেষ গিয়েছিলাম।

প্রথমবারে নভোথিয়েটর ছিলো এক মুগ্ধতা। পুরো জায়গাটি সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনড, চমৎকার একটা পরিবেশ। মূল প্লানেটরিয়ামের বাইরের অংশটিও দেখার মত, সেখানে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের তুলনামূলক ঘূর্ণনের একটি মডেল রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন গ্রহের মডেল। একটি রাইড সিমুলেটর, যেখানে রোলার কোস্টারের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে, যদিও আমার এই অভিজ্ঞতা নেই। পরবর্তীতে আরো অনেক কিছু যোগ হয়েছে, যা প্রথমবার যখন গেছিলাম তখন ছিলো না। যেমন, একটি পরমাণু তথ্য কেন্দ্র, একটি 5D Movie Theatre (যেটি মূলত ত্রিমাত্রিক, সাথে চেয়ারের মুভমেন্ট ও আরো কিছু ইফেক্টের মাধ্যমে সাধারণ ত্রিমাত্রিক থেকে বেশি জীবন্ত করে উপস্থাপন করা হয়)।

মূল নভোথিয়েটারের হলটিতে যখন ঢুকছিলাম, একটা ভয়ভয় অনুভব করছিলাম। প্রবেশের জায়গাটাতেও একটা বিশেষ ভাব আছে। ভেতরে একরকম আলোআঁধারির খেলা। বিশাল গোল পর্দা, একটা অন্যরকম পরিবেশ।

শো যখন শুরু হলো, জার্নি টু ইনফিনিটি, পুরো সময়টা মনে হয়েছে যেন মহাকাশেই আছি। বাইরে উজ্জ্বল দুপুর মনেই হচ্ছিলো না, যেন কোন এক রাতে তারার দেশে হারিয়ে যাচ্ছি। যখন কোন বিস্ফোরণ, বা কোন জ্যোতিষ্ক গোল পর্দার ওপারে হারিয়ে যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন মাথায় এসে পড়ছে। খুবই প্রাণবন্ত পরিবেশ।

জানতে পারলাম, আগে এর সাথে আরেকটি সমুদ্র বিষয়ক ডকুমেন্টরী প্রদর্শিত হত, যার চুক্তির মেয়াদ সম্ভবত শেষ হয়ে গেছিলো৷ তাই সেই শো টি দেখা হয়নি।

দ্বিতীয়বার যখন গেছি, অনুভূতি প্রায় একইরকম৷ এবার সাথে আরেকটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ডকুমেন্টারি দেখানো হলো, ‘এই আমাদের বাংলাদেশ’।

এই ডকুমেন্টরীগুলো বেশ উচ্চমানের, খুবই জীবন্ত। নভোথিয়েটারের মাঝামাঝি GSS Helios নামক একটি উচ্চমানের প্রোজেকশন যন্ত্র এবং এর সাথে Astrovision 70 নামক আরেকটি প্রোজেকশন যন্ত্রের সমন্বয়ে ডকুমেন্টারিগুলো প্রদর্শিত হত।

তৃতীয়বার যখন গেলাম, প্রবেশ টিকিট দ্বিগুন হয়ে গেছে তখন। অবশ্যি, টাকা তো আমার নিজের পকেট থেকে যায়নি। আগের জার্নি টু ইনফিনিটি শো এখন আর দেখানো হয় না। তার পরিবর্তে নতুন কিছি ডকুমেন্টারি যুক্ত হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নটি দেখানো হয়। আমরা দুপুরের দিকে গেছিলাম, তখন সম্ভবত মিশন টু দা ব্লাকহোল দেখানোর কথা ছিলো।

যাই হোক, আগের মতই বাইরের এয়ার কন্ডিশনড পরিবেশ, ভালোই। নতুন অনেককিছু যুক্ত হয়েছে দেখলাম। মূল প্রজেকশন হলে প্রবেশ করলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা আর আলো আঁধারীর খেলা। তারপর মাঝখানে গোল যে GSS Helios নামক অসাধারণ ডিভাইসটি আছে তা নিচে নেমে গেলো (ওটা ওঠানামা করতে পারে), এমনকি একবারও উঠলো না শো চলাকালীন, অর্থাৎ, পুরো শো চলাকালীন এই ডিভাইসটি ব্যবহৃত হয়নি, সম্ভবত শুধু এস্ট্রোভিশন ৭০ দিয়ে দেখানো হয়েছে। যাহোক, শো শুরু হলো।

কিন্তু না, যেই শো দেখতে এসেছি তা নয়, শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর জীবনীর উপর নির্মিত একটু ডকুমেন্টরী। ভাবলাম, এবার তো ভাসানি নভোথিয়েটার না, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নভোথিয়েটারে এসেছি। একটু মেনে নিতেই হবে।

৫ মিনিট চলে গেলো। তারপর ১০ মিনিট। তারপর ১৫ মিনিট, কিন্তু ডকুমেন্টরী তো শেষ হয় না। তারপর ১ ঘন্টার শো এর ৩০ মিনিট চলে গেলো, চলছেই। অবশেষে ৩২ মিনিটে গিয়ে শেষ হলো 😮।

আর কোয়ালিটি নিয়ে কী বলব? বড় ডিসপ্লের ফোনে 240P ভিডিও দেখলে যেরকম হয়, সেরকম। একদমই ক্লিয়ার না। তাছাড়া গোল পর্দার একদমই উপযুক্ত না, সমান্তরাল পর্দার জন্য তৈরি ডকুমেন্টরী মনে হয়েছে। এর আগে এই আমাদের বাংলাদেশ ডকুমেন্টারিতে ৭ই মার্চের ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের কিছু কথক, বাংলাদেশের গ্রাম শহরের কিছু চিত্র ছিলো। সেটি প্রদর্শিত হয়েছিলো মূল শো এর পরে। ১০ মিনিট মত হবে হয়ত। কিন্তু এই শোতে গাড়িতে করে টুঙ্গিপাড়া ঘুরিয়ে আনা হলো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত কিছু বক্তব্য শোনানো হলো। সত্যি বলতে, এমনটা বর্তমান সময়ে না হওয়াটাই অস্বাভাবিক বলা যায়। কিন্তু তাই বলে এই শো ৩২ মিনিট আর মূল মহাকাশ বিষয়ক শো ২৮ মিনিট? তাহলে কীভাবে এটা নভোথিয়েটার নাম হতে পারে? জাস্ট উপরের পর্দাটা গোল বলে? বাই দা ওয়ে, গাড়িতে করে যখন একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছিলো ডকুমেন্টরীতে, বিশাল পর্দায় সে অনুভূতি ভালোই ছিলো।

এরপর মূল শো, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। ব্লাকহোল বিষয়ে কিছু দেখানোর কথা, যেহেতু ডকুমেন্টারির নাম মিশন টু ব্লাক হোল। কিন্তু মনে হচ্ছিলো এটা অন্য কোন শো। কিছুক্ষণ পর আমার ধারণা সত্য প্রমাণ হলো, যখন শো এর নাম দেখানো হলো জার্নি টু দা স্টারস। বাই দা ওয়ে, শো এর নাম ভুল হতেও পারে আমার, কয়েক বছর আগের কথা যেহেতু। তবে এটা বেশ মনে আছে, যে শো দেখানোর কথা তা প্রদর্শিত হয়নি।

এখানেও Helios ডিভাইসটি ব্যবহার হয়নি। গোল পর্দার সমস্যা সেভাবে মনে হয়নি, তবে ছবি এখানেও তত স্পষ্ট না। ওরকম বিশাল পর্দায় দেখার জন্য সেরকম হাই রেজ্যুলেশনের জিনিসও দরকার। কিন্তু রেজ্যুলেশনের যথেষ্ট ঘাটতি এখানেও মনে হয়েছে। আগের প্রাণবন্ত ফিল পাইনি। ২৮ মিনিটের শোতে যে আসলে কী দেখানো হলো, আর কী বোঝানো হলো তাও কিছু বুঝিনি 😐😐

সবশেষে, কারো যদি নভোথিয়েটারে প্রথমবার যাওয়ার আগ্রহ থাকে, তাকে বলবো, হ্যাঁ, ভালো লাগার অনেক কিছু এখানে আছে। অনেক কিছুই মুগ্ধ করার মত আছে। তবে যথেষ্ট ধৈর্য্য প্রয়োজন হতে পারে। সেইসাথে দিনশেষে অনেক হতাশা নিয়ে ফিরে আসার মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে রাখাই ভালো।

প্রচ্ছদের ছবিটি উইকিমিডিয়া থেকে নেওয়া। © Nahid Sultan / Wikimedia Commons / CC BY-SA 4.0

0 0 vote
Article Rating
Default image
তাহমিদ হাসান
এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x