গন্ডার নিয়ে যে ফ্যাক্টগুলো ইন্টেরেস্টিং…

মোটা চামড়া আর নাকের অদ্ভুত শিং নিয়ে গন্ডার আমাদের সবার পরিচিত। মজার ব্যপার হলো, গন্ডারের ইংরেজি নামের মধ্যেও এর শিংয়ের কথা আছে, Rhinoceros অর্থ শিংযুক্ত নাক।

গন্ডার খাদ্যাভ্যাসে তৃণভোজী। একসময় এরা ছিল নর্থ অ্যামেরিকা আর ইউরোপের বাসিন্দা। কিন্তু এখন এদের দেখা পাওয়া যায় শুধু এশিয়া আর আফ্রিকায়। পৃথিবীর বুকে বিচরণ করা প্রথম গন্ডাররা ছিলো পশমাচ্ছাদিত গন্ডার (Woolly rhino), যারা এই গ্রহে পদচিহ্ন রেখে গেছে ৫০ মিলিয়ন বছর আগে, যদিও বর্তমানে বিলুপ্ত।

বিভিন্ন প্রজাতির গন্ডার

বর্তমানে, পৃথিবীতে রয়েছে পাঁচ প্রজাতির গন্ডার। কালো গন্ডার (Black rhino) এবং সাদা গন্ডার (White rhino), যাদেরকে খুঁজে পেতে যেতে হবে আফ্রিকায়। আর ভারতীয় গন্ডার (Indian rhino), যাদের আরেকটি নাম বৃহত্তর এক শৃঙ্গযুক্ত গণ্ডার (Greater one-horned rhino), জাভার গন্ডার (Javan rhino), সুমাত্রার গন্ডার (Sumatran rhino) এই তিনটি প্রজাতির বাস এশিয়াতে।

কালো, সাদা আর সুমাত্রার গন্ডারদের দুটি করে শিং রয়েছে। ভারতীয় আর জাভার গন্ডারদের শিং একটি করে, এমনকি জাভার কিছু মাদী গন্ডারের শিং-ই নেই। গন্ডারের এই শিং অন্য প্রাণীদের চেয়ে আলাদা। এটা কোন অস্থি না এবং কঙ্কালতন্ত্রের সাথে সংযুক্ত না। গন্ডারের শিং সলিড, ফাঁপা নয়। আজীবন এটা বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিংটি শিকারীর আঘাতপ্রাপ্ত হলে নতুন একটি গড়ে উঠবে।

সাদা গন্ডার আর কালো গন্ডার নামে যেরকম মনে হচ্ছে ঠিক সেরকম না। দুটোর রং কাছাকাছি, ধূসর বর্ণ। ধারণা করা হয়, White Rhyno নামটি আফ্রিকান শব্দ wyd অথবা ডাচ শব্দ wijd/whyde, বা weit থেকে এসেছে, যাদের প্রত্যেকের অর্থ wide তথা প্রশস্ত। মানে কিনা, এই সাদা সাদা নয়!

সাদা গন্ডার
সাদা গন্ডার Ikiwaner – [GFDL 1.2]
কালো গন্ডার
কালো গন্ডার – Yathin S Krishnappa [CC BY-SA 3.0]

ভারতীয় গন্ডারদের একটা নিকনেম হলো ইউনিকর্ন। ভারতীয় আর জাভার গন্ডারদের দেখলে, যদিও আসলে নয়, এদের চামড়ার বিশেষ গঠনের জন্য আপনার মনে হতে পারে যেন এক বর্মে আচ্ছাদিত সৈনিক।

ভারতীয় গন্ডার
ভারতীয় গন্ডার – Ltshears
জাভার গন্ডার
জাভার গন্ডার

সুমাত্রার গন্ডারদের কথা যদি বলি, এদের গায়ের রং অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। লালচে-বাদামি বর্ণের গন্ডারগুলো দেখতে বেশ!

সুমাত্রার গন্ডার
সুমাত্রার গন্ডার – International Rhino Foundation [CC BY 2.0]

ওজন ও উচ্চতা

উচ্চতার দিক দিয়ে গন্ডার গড়ে প্রায় ৬ ফুট, বেশিরভাগ মানুষের চেয়ে সামান্য বেশি। তবে সুমাত্রার গন্ডারদের অনেকটাই কম উচ্চতা ৪ ফুট ৩ ইঞ্চির মত।

ভারতীয় গন্ডারেরা ওজনে সবচেয়ে বেশি, ২৫০০ কেজি থেকে ৩২০০ কেজি পর্যন্ত। অন্যদিকে সুমাত্রার গন্ডারেরা সে তুলনায় বেশ শুকনো, ওজনে প্রায় ৭০০ কেজি।

সাদা গন্ডারদের ওজন ১৭০০-২৩০০ কেজি। এদের শুধুমাত্র মাথার ওজন হতে পারে ৯০০ কেজির বেশি।

গন্ডারের শিং

সাদা গন্ডারদের শিং সবচেয়ে বড়। আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, সবচেয়ে দীর্ঘ যে শিংয়ের সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে, দৈর্ঘ্যে তা প্রায় ১.৭ মিটার তথা সাড়ে ৫ ফুট, মোটামুটি আমার সমান।

পোচার তথা চোরাশিকারীরা এই শিংয়ের জন্য গন্ডারকে হত্যা করে থাকে এবং এরপর ব্লাক মার্কেটে এই শিং বিক্রি করে দেয়। গন্ডারের শিং খুবই দামী হতে পারে, কখনো স্বর্ণের চেয়েও বেশি। কেননা, এশিয়ার অনেক মানুষের ভ্রান্তবিশ্বাস রয়েছে এই শিংয়ের ক্ষমতায় অসুস্থ মানুষ আরোগ্য লাভ করবে।

দৃষ্টি ও ঘ্রাণশক্তি

গন্ডারের দৃষ্টিশক্তি খুবই ক্ষীণ এবং তারা কাছের জিনিসই দেখতে পায়। ফলে, আপনি খুব কাছে না গেলে এরা আপনাকে দেখতে পাবে না। গন্ডার কোন পোচার বা জীপ বা এমন কিছু দেখতে পেলে নিজেকে রক্ষার জন্য সাধারণত একে চার্জ করবে।

দুর্বল দৃষ্টিশক্তির বিপরীতে এদের রয়েছে প্রথর ঘ্রাণশক্তি। এমনকি, প্রতিটি গন্ডারের আলাদা ঘ্রাণ রয়েছে। এরা একে অপরকে ঘ্রাণের মাধ্যমে চিনে থাকে।

আরো কিছু ফ্যাক্টস

গন্ডার পৃথিবীর সেই তিনটি প্রাণীর একটি, যারা লাফাতে পারে না। বাকি দুটি হলো হাতি ও সারং (Pronghorn)। তবে গন্ডার খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে, ঘন্টায় ৩০-৪০ মাইল পর্যন্ত। সবচেয়ে দ্রুত মানুষটিও এর অর্ধেক গতি অর্জন করতে পারে না। কাজেই, কোনভাবে কখনো গন্ডারের তাড়া খেলে দৌড়ে এর সাথে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এসময় নিজেকে বাঁচাতে করণীয় হলো, নিকটতম গাছটিতে উঠে যাওয়া।

আরেকটা মজার বিষয় হলো, গন্ডার আগুন পছন্দ করে। অন্যান্য প্রাণী যেখানে আগুনকে ভয় পায় এবং এড়িয়ে চলে, এরা ঠিক উল্টো। এরা আগুনকে ভয় পায় না।

রোদে পুড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে আমরা কেউ কেউ অনেক কিছুই করি। কখনো ক্রিম ব্যবহার করি, অথবা মাথায় ছাতা দিই। আপনার হয়ত মনে হতে পারে গন্ডারের এরকম কিছু প্রয়োজন নেই, এর চামড়া একে রোদ থেকে রক্ষা করার মত। কিন্তু আসলে এরকম না। গন্ডারের চামড়া রোদ এবং পোকামাকড়ের কামড়ের প্রতি সেনসিটিভ। একারণে এরা নিজেকে কাদামাটিতে গড়িয়ে নিতে পছন্দ করে। যখন তা শুকিয়ে যায় তখন এটা স্কিনের জন্য একটা প্রটেকশনের মত কাজ করে।

গন্ডারেরা বিলুপ্তির দিকে

সবশেষে, যেটা আপনার শুনতে সম্ভবত ভালো লাগবে না, এবং জেনে আমারও খারাপ লাগছে, হয়ত, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না অবশ্যই, গন্ডারের দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

জাভার গন্ডার এবং সুমাত্রার গন্ডাররা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ স্থলচরদের মধ্যে ধরা হয়। কেউ কেউ ধারণা করেন, জাভার কোন গন্ডার-ই আসলে আর অবশিষ্ট নেই, কারণ কিছু সময় হলো, কেউই তাদের দেখেনি।

বাকিরাও বিলুপ্তির আশঙ্কায় রয়েছে। এমনকি ৫০-৫০ চান্স রয়েছে ৩ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রাণীদের হারিয়ে যাওয়ার। প্রতি ১১ ঘন্টায় একটি গন্ডার এর শিংয়ের জন্য পোচারদের দ্বারা বিকলাঙ্গ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে।

আরো দেখুন: জানা অজানা পিঁপড়েকথন

About the Author: তাহমিদ হাসান

এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?

You May Also Like

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of