কোমোডো ড্রাগন: এক শক্তিশালী, আক্রমণাত্মক আর দুর্ধর্ষ শিকারী প্রাণী

এরা সেরকম কোন রূপকথার ড্রাগন না, যাদের মুখ দিয়ে আগুন বের হয়, কিংবা যারা আকাশে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু এরা পৃথিবীর বুকে হেঁটে চলা লিজার্ডদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, লম্বায় প্রায় ১০ ফুট (৩ মিটার) পর্যন্ত। এরা শক্তিশালী, আক্রমণাত্মক আর দুর্ধর্ষ শিকারী।

এরা হলো, কোমোডো ড্রাগন! স্থানীয়ভাবে এরা ‘ওরা’ (ora) অথবা ‘স্থল কুমির’ (land crocodile) নামে পরিচিত। কোমোডো ড্রাগন নাম এসেছে রিউমার থেকে। রিউমার ছিলো, ইন্দোনেশিয়ার কোমোডো দ্বীপে ড্রাগনের মত কোন প্রাণী আছে। ১৯১০ সালে কোমোডো সাগরে একটি বিমান ক্র্যাশ করলে পাইলট সাঁতরে কোমোডো দ্বীপে পৌছান এবং এই প্রজাতির আবিষ্কার করেন।

প্রায় ২০০ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন, লম্বায় ১০ ফুট পর্যন্ত, পেশীবহুল দেহ এবং মাটিতে ধীরগতির চলাফেরা দেখে আপনি মনে করতে পারেন, এদের দেহ সাঁতারের জন্য একদমই উপযুক্ত নয়। কিন্তু আর বেশিরভাগ সরীসৃপের মত এরা খুব ভালো সাঁতারু। দক্ষিণ-পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার ৫টি দ্বীপে এদের বাস এবং প্রায়ই এদের খাদ্যের সন্ধানে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যেতে দেখা যায়।

পূর্ণবেগে দৌড়ানোর সময় এদের দৌড়ের বেগও খারাপ না। বিশেষ করে তারা যখন শিকারে থাকে। তারা প্রথমে ধীরে শিকারের দিকে এগুতে থাকে অথবা শুয়ে থেকে শিকারের আসার অপেক্ষা করে। এরপর তারা ক্ষীপ্রভাবে শিকারকে আক্রমণ করে। এদের সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত।

আর সব সরীসৃপের মত এদের ঘ্রাণ নেওয়ার পদ্ধতি আমাদের থেকে ভিন্ন। খন্ডিত জিহ্বার সাহায্যে এরা বাতাস থেকে আণুবীক্ষণিক স্বাদ কণা নেয়। এরপর জিহ্বা মুখের ভেতর নিয়ে জ্যাকব’স অর্গান নামের অঙ্গে এগুলো পাঠিয়ে দেয়। এর অঙ্গ কণাগুলোকে প্রসেস করে এবং এর ফলে তারা কীসের গন্ধ এবং তা কোথা থেকে আসছে তা বুঝতে পারে। এমনকি ৫ মাইল দুর থেকে এরা গলিত মাংসের গন্ধ পেয়ে তার উৎস চিহ্নিত করতে পারে।

কোমোডো ড্রাগনের বৃদ্ধি অনির্দিষ্ট। মানুষের ক্ষেত্রে ২০-২৫ বছরের পর আমাদের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। যতদিন বেঁচে থাকে, এদের বৃদ্ধি ঘটে। এরা ক্ষুধার্থ আর সবসময়ই শিকারের খোঁজে থাকে। একবারে বিশাল পরিমাণ খাবার এরা খেতে পারে। প্রশস্ত আর ফ্লেক্সিবল চোয়ালের কারণে এরা সহজেই মধ্যম আকারের শূকরছানা একবারে গিলে নিতে পারে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, এক বসাতে এরা দেহের ওজনের ৮০% পর্যন্ত খেয়ে নিতে পারে।

মানুষখেকো হিসেবে কোমোডো ড্রাগনের কুখ্যাতি আছে। এটা মিথ্যা নয় যে, কোমোডো ড্রাগন কবর খুঁড়ে সেখানে শায়িত মৃতদেহ খেয়ে ফেলতে পারে। তাই, যে এলাকায় এদের বাস, সেখানকার মানুষেরা তাদের প্রিয় মানুষদের কবরের চারপাশে পাথরের ঢিবি গড়ে দেন।

তবে তাদের দ্বারা মানবমৃত্যুর ঘটনা দুর্লভ। ১৯৭০ সালের পর ১৯৭৪, ২০০০, ২০০৭ আর ২০০৯ সালে মোট চারবার তাদের দ্বারা মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। সর্বশেষ ২০০৯ সালে একজন আপেল গাছ থেকে পড়ে গেলে, দুটি কোমোডো ড্রাগন তাকে থেঁতলে দেয়। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু ক্ষত থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।

যাই হোক, আসলে এরা বিষাক্ত। ১৯৭০ সালের এক গবেষণা থেকে দীর্ঘদিন ধরে গবেষকরা বিশ্বাস করেছেন কোমোডো ড্রাগনের লালায় মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ আছে যা এক দংশনেই শিকারকে মেরে ফেলতে পারে।

২০০৯ সালে কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির জীবরসায়নবিদ ব্রায়ান ফ্রাই এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন ঠিক কোন জীবাণু এর জন্য দায়ী। এজন্য তিনি কয়েকটি কোমোডো ড্রাগনের মুখ থেকে লালার নমুনা নেন। সেখানে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া ছিল বটে, কিন্তু তা স্তন্যপায়ীদের মুখ থেকে অনেক কম এবং এমন কিছু সেখানে ছিলো না, যা কোমোডো ড্রাগনের কামড়ে টিস্যুর বিভেদ বা রক্ত হারানোর জন্য দায়ী হতে পারে।

এরপর তিনি এর খুলির MRI স্ক্যান করেন। স্ক্যানে নিচের চোয়ালে ক্ষুদ্র দুটি বিষগ্রন্থি ধরা পড়ে। এই বিষের মধ্যে কিছু টক্সিক প্রোটিন রয়েছে, যা কোমোডো ড্রাগনের দংশনে সৃষ্ট প্রভাবগুলোর কারণ।

দেখতে যদিও ভয়ঙ্কর, এরা খেলাধুলা পছন্দ করে। বন্দী প্রাণীদের জুতা বা বেলচা এরকম দৈনন্দিন ব্যবহার্য বস্তু বা ফ্রিসবি, রোপ এরকম খেলনা নিয়ে খেলতে দেখা গেছে। ক্র্যাকেন নামের স্মিথসনিয়ান ন্যাশনাল জু-তে বন্দী একটি ড্রাগন চিড়িয়াখানার কর্মীদের অদ্ভুত আচরণ শুরু করলে তার উপর একটি গবেষণা চালানো হয়।

ক্র্যাকেনকে দাঁত দিয়ে কর্মীদের জুতার ফিতা টানা বা পকেট থেকে সাবধানে কিছু বের করে নিতে দেখা যায়। চিড়িয়াখানার রক্ষীরা তার বেষ্টনীতে বিভিন্ন আইটেম যেমন, বক্স, ব্লাঙ্কেট, ফ্রিসবি, জুতা এসব রেখে দেন। রক্ষীদের সাথে তাকে দড়ি টানাটানি খেলতেও দেখা যায়। এগুলোকে খেলার মধ্যে ধরে নেওয়া হয়, কেননা, এটি কোন পুরস্কার বা খাদ্যের জন্য এমনটা করেনি আবার এর মধ্যে কোন আক্রমণাত্মক মনোভাবও ছিলো না।

আরো দেখা যায়, সে কমান্ড শিখে নিতে পারে, যেমন, বাঁশির শব্দে রক্ষীর দিকে যাওয়া অথবা কর্মীরা উজ্জল গ্লোভস পড়লে খাওয়ার সময়ের সংকেত এধরণের বিষয়গুলো শিখে নেওয়ার ক্ষমতা এদের আছে।

সোর্স:

0 0 vote
Article Rating
Default image
তাহমিদ হাসান
এইতো, প্রতি ষাট সেকেন্ডে জীবন থেকে একটি করে মিনিট মুছে যাচ্ছে, আর এভাবেই এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর পথে, নিজ ঠিকানায়। জীবন বড় অদ্ভুত, তাই না?
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x